পরিশ্রমে বদলেছে ভাগ্য, কৃষকের নতুন নাম ‘বেগুন উদ্যোক্তা’
দিনাজপুর টিভি ডেস্ক
আপলোড সময় :
১৭-০৩-২০২৫ ০৭:১৬:৩৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৭-০৩-২০২৫ ০৭:১৭:২৩ অপরাহ্ন
পরিশ্রমে বদলেছে ভাগ্য, কৃষকের নতুন নাম ‘বেগুন উদ্যোক্তা’
বিপ্লব শিকদার এখন এলাকায় ‘বেগুন বিপ্লব’ নামেই পরিচিত। তাঁর নামের সঙ্গে ‘বেগুন’ যুক্ত হলো কেন? পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা স্ত্রী সংগীতা রাণী হাসলেন। বিপ্লবও লজ্জা না পেয়ে গর্বের সঙ্গে বললেন, "বেগুন চাষ করেই আমার ভাগ্য ফিরেছে, তাই সবাই এই নামে ডাকে।"
বরগুনার তালতলী উপজেলার পাজরাভাঙ্গা গ্রামে ঢুকলেই বোঝা যায়, এই নামের প্রচলন কতটা। এক যুবককে জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, "বেগুন বিপ্লব? ওই তো সামনেই!"
সামনে এগিয়ে চোখে পড়ল সুসজ্জিত এক বেগুন খেত। সারি সারি সবুজ গাছ, আর তাতে ঝুলে থাকা বড় বড় বেগুন। মন জুড়িয়ে যাওয়ার মতো দৃশ্য। একটু কাছে যেতেই দেখা গেল, বিপ্লব আর সংগীতা পরম যত্নে গাছগুলোর পরিচর্যা করছেন।
রোদ থেকে একটু ছায়ায় এসে বসতেই বদলে গেল বিপ্লবের মুখভঙ্গি। বললেন, "জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, তারপরই এসেছে এই সাফল্য।"
তারপর শুরু হলো তাঁর সংগ্রামের গল্প। বাবা নির্মল চন্দ্র শিকদার ছিলেন কৃষক। ছয় একর জমি ছিল, যা দিয়েই সংসার ভালো চলছিল। কিন্তু জমিজমা নিয়ে মামলা শুরু হলে বিপদ নেমে আসে পরিবারের ওপর। চার একর জমি বিক্রি করতে হয়, আর্থিক সংকটে বিপ্লবের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।
বাঁচার তাগিদে নানা রকম কাজ করেছেন। কখনো ছোটখাটো সবজির ব্যবসা, কখনো খুলনা-যশোর থেকে সবজি এনে পাইকারি বিক্রি। কিন্তু ব্যবসার ওঠানামায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়েছিলেন বিপ্লব।
এই কঠিন সময়েই একদিন শুনলেন রাখাইন সম্প্রদায়ের এক বিশেষ জাতের বেগুনের কথা। এটি নাকি আকারে বড়, স্বাদে অনন্য, আর চাহিদাও প্রচুর! বিপ্লব খোঁজ নিতে শুরু করলেন। জানতে পারলেন, সঠিক পরিচর্যা করলে এই বেগুনই হতে পারে ভাগ্য বদলের চাবিকাঠি। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন—এবার এই বেগুন চাষ করবেন।
২০১১ সালে বাড়ির ২০ কাঠা জমিতে এই বিশেষ বেগুন চাষ শুরু করলেন। প্রথম বছরেই প্রায় ৩০ হাজার টাকা লাভ হলো। ফলন যেমন ভালো, চাহিদাও তেমনি বেশি। সাফল্য দেখে তিনি জমির পরিমাণ বাড়াতে থাকেন। এখন তিনি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২ একর জমিতে বেগুন চাষ করছেন। প্রতি মৌসুমে লাভ করেন চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা।
এই সাফল্যের পেছনে স্ত্রী সংগীতা রাণীর অবদানও কম নয়। খেতের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত সবকিছুতেই তিনি পাশে থাকেন। সংগীতা বলেন, "এই বেগুন বিক্রি করেই প্রতি বছর চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় হয়। সংসারে এখন অভাব নেই, দুই ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছি।"
অগ্রহায়ণ মাসের শুরু থেকে ১৫ ফাল্গুন পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ১০০ কেজি বেগুন ওঠে খেত থেকে। স্থানীয় বাজারে তা ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়।
বিপ্লবের এই সাফল্য শুধু তাঁর জীবন বদলেই দেয়নি, আশপাশের অনেক কৃষকও অনুপ্রাণিত হয়ে বেগুন চাষ শুরু করেছেন।
বিপ্লব এখন শুধু একজন সফল কৃষক নন, এলাকার অনুপ্রেরণার নাম। একসময় যে জমি হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, আজ সেই জমিতেই বেগুনের রাজত্ব গড়ে তুলেছেন। তাই তো মানুষ ভালোবেসে তাঁকে ‘বেগুন বিপ্লব’ বলেই ডাকছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Dinajpur TV
কমেন্ট বক্স